5S: উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির কার্যকর পদ্ধতি



উৎপাদন শিল্পে উন্নত মান এবং দক্ষতা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে গেলে শুধুমাত্র পণ্য উৎপাদন নয়, বরং উৎপাদন প্রক্রিয়াও সুশৃঙ্খল হতে হবে। এই সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে 5S একটি অত্যন্ত কার্যকরী পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদনশীলতা ও প্রক্রিয়ার মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে 5S পদ্ধতি অত্যন্ত সফল। এটি মূলত একটি জাপানি পদ্ধতি, যা কর্মস্থলের সংগঠন, পরিচ্ছন্নতা, এবং কর্মপ্রবাহকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সহায়তা করে

5S-এর মূলনীতি

5S পদ্ধতি পাঁচটি জাপানি শব্দের আদ্যাক্ষর দ্বারা তৈরি হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। 5S-এর প্রতিটি ধাপ একটি সুশৃঙ্খল কর্মস্থল গঠনে সহায়ক:

1.    Seiri (整理 - Sort):
প্রথম ধাপে কর্মস্থল থেকে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলা হয়। এর মাধ্যমে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কর্মস্থলে রাখা হয়, যা কাজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহৃত হবে। অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর উপস্থিতি কর্মক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, যা উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে

2.    Seiton (整頓 - Set in Order):
এই ধাপে, প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সুশৃঙ্খলভাবে রাখা হয়। প্রতিটি জিনিসপত্রের নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা হয়, যাতে যেকোনো কিছু সহজেই খুঁজে পাওয়া যায় এবং সময় নষ্ট না হয়। উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং সময়মতো কাজ শেষ করতে এটি অত্যন্ত কার্যকর

3.    Seiso (清掃 - Shine):
তৃতীয় ধাপে কর্মস্থল পরিচ্ছন্ন রাখা হয়। মেশিন, সরঞ্জাম এবং কর্মক্ষেত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় যাতে ধুলো বা ময়লা কোনো সমস্যার সৃষ্টি না করে। পরিষ্কার কর্মক্ষেত্র শুধু দেখতে সুন্দর নয়, বরং এটি দুর্ঘটনা ও যন্ত্রপাতির ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে

4.    Seiketsu (清潔 - Standardize):
এই ধাপটি পূর্ববর্তী তিনটি ধাপের মান ধরে রাখার প্রক্রিয়া। কর্মস্থলের জন্য নির্দিষ্ট মান তৈরি করা হয় এবং সেই মান অনুযায়ী সবকিছু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন কর্মীদের দায়িত্ব ও কাজের প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুশৃঙ্খল করে তোলে

5.    Shitsuke ( - Sustain):
শেষ ধাপটি হলো এই 5S পদ্ধতির নিয়মগুলো দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা। কর্মীদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি কার্যকর থাকে। ধারাবাহিকভাবে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ এবং নিরীক্ষা করা হয়

5S পদ্ধতির উপকারিতা

1.    উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি: 5S পদ্ধতির মাধ্যমে সময় বাঁচানো যায় এবং কাজের গতি বাড়ে। কর্মস্থল সুশৃঙ্খল হওয়ার ফলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দ্রুত খুঁজে পাওয়া যায়, যা কাজের দক্ষতা বাড়ায়

2.    মানসিক চাপ হ্রাস: 5S পদ্ধতিতে সংগঠিত কর্মক্ষেত্র কর্মীদের মানসিক চাপ কমায়। অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বা বিশৃঙ্খল কর্মস্থল সাধারণত মানসিক চাপ বাড়ায় এবং কাজের মানও নষ্ট করে

3.    উন্নত নিরাপত্তা: পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমায়। ময়লা, ধুলো, বা অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে, যা 5S পদ্ধতির মাধ্যমে সহজেই এড়ানো যায়

4.    ব্যয় হ্রাস: অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও অপচয় কমানোর মাধ্যমে উৎপাদন খরচও হ্রাস পায়। সরঞ্জামের যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাড়ার ফলে যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কালও বাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থ সাশ্রয় করে

5.    নিয়মিত উন্নয়ন: 5S পদ্ধতি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক উন্নয়নের ওপর জোর দেয়। কর্মক্ষেত্র ও প্রক্রিয়াকে নিরবচ্ছিন্নভাবে উন্নত করতে এটি সহায়ক, যার ফলে প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘমেয়াদে উন্নত হয়

বাংলাদেশের শিল্পখাতে 5S-এর গুরুত্ব

বাংলাদেশের গার্মেন্টস ও উৎপাদনশিল্পে 5S পদ্ধতি খুবই কার্যকর। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে কর্মক্ষেত্রকে সুশৃঙ্খল ও কার্যকর রাখতে হবে। 5S পদ্ধতি গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ উন্নত করতে এবং উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি শুধু উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে না, বরং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং খরচ কমাতে সহায়ক হয়

5S পদ্ধতি একটি কার্যকর কর্মক্ষেত্র তৈরি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি শুধু কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নয়, বরং উন্নত উৎপাদন এবং সময়মতো কাজ শেষ করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের গার্মেন্টস, উৎপাদন এবং অন্যান্য শিল্পখাতে 5S পদ্ধতি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হলে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও সাফল্য নিশ্চিত হবে

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url